হাটখোলা ব্রিজের নিচে দেখা হয়ে গেলো ছোটবেলার এক স্যারের সাথে। এই লোক স্কুলে ক্লাস সিক্সে আমাদের ইংরেজি ক্লাস নিতেন। নাম শুক দেব ঢালী। আচার ব্যবহার ছিলো চামারের মত। পকেটে সবসময় একটা কৌটায় করে পানমসলা নিয়ে ঘুরতেন। প্রায় ত্রিশ পদের মসলা মেশানো থাকতো সেখানে। ঐতিহ্যবাহী জিনিস। আমরা অবশ্য ভাবতাম সে নেশা খায়। কৌটায় করে হেরোইন নিয়ে ঘুরে। এইজন্য নীতিগতভাবে তাকে বিরাট অপছন্দ করতাম…

আমার এক জীবনে এই শুক দেব আমাকে কম জ্বালায় নাই। আজীবন ফাস্ট বয় ছিলাম। শুধুমাত্র তার বাসায় গিয়ে কোচিং না করায় সে আমাকে শারীরিক শিক্ষায় ফেইল করিয়ে রোল ১ থেকে ৬৩ বানিয়ে দিসিলো। ফলাফলস্বরুপ তৎকালীন ঢাকার সবচেয়ে সেরা বিদ্যালয় থেকে টিসি নিয়ে আমাকে স্কুল পাল্টাতে হয়। আজ শূয়রটাকে হাতের নাগালে পেয়েছি। ওকে ছাড়া যাবেনা। মারতে হবে, প্রচুর মারতে হবে…

শুক দেব প্রথম দেখায়ই আমাকে চিনে ফেললো। তবে নাম মনে রাখতে পারেনি। আমি মনে মনে ডিসিশন নিলাম, শূয়রটাকে আজ চিরজীবনের মত আমার নাম মুখস্ত করিয়ে দিবো। বাবার নাম ভুলে গেলেও আমার মনে রাখতে হবে। প্রয়োজনে নামের শেষে ওর বংশতগত টাইটেলও লাগিয়ে নিবো, কাজী নিপু দেব ঢালী…

– কি করিস তুই এখন?
– বিজনেস করি। মিউজিক ডিস্ট্রিবিউশনের কাজ।
– বাহ। ভালোই উন্নতি করেছিস।
– জ্বি স্যার। দোয়া তো করে দিসিলেন। তারপর থেকে খালি উড়তেছি। সবই আপনার আশির্বাদের ফসল।
– তোদের ব্যাচের সবাই ফেসবুকে আছে। তোকে পাই না কেনো?
– সার্চ দেন Kazi Nipu লিখে। নামের পাশে টিকচিহ্নওয়ালা পেজ পাবেন।
– তুই আমাকে অ্যাড পাঠা।
– স্যার, ভেরিফাইড পেইজ চালাই। পেজ থেকে যাকে তাকে তো আর অ্যাড করা যায়না। ফলোয়ার অপশন খোলা আছে। লাইক দিয়ে সাবস্ক্রাইবার হয়ে যান।

শুক দেবের মুখে বেদনার ছাপ লক্ষ্য করা গেলো। তাকে হালকা আহত মনে হচ্ছে। ভালো হয়েছে। আমি তো চাইই তোরে অপমান করতে। জীবনটা অর্ধেক নষ্ট কইরা দিসস তুই হারামজাদা…

আমি শুক দেবকে কফি খাওয়ানোর প্রস্তাব দিলাম। শুক দেব কুকুরের মত আমার পেছন পেছন আসতে লাগলো। শুক দেবকে নিয়ে আমি প্রথমেই একটি ভাতের হোটেলে ঢুকলাম। এই হোটেলের স্টাফরা আমাকে বিরাট সম্মান করে। আমরা ভেতরে ঢুকতেই গরুর কিমা বানানোর বাবুর্চি মহিউদ্দীন চাপাতি হাতে এগিয়ে এলো। ডান হাতে চাপাতি উচিয়ে ধরে সে আমাকে সালাম দিলো। আমি সালাম গ্রহণ করে তাকে শুকদেবকে দেখিয়ে দিয়ে বললাম, “এইটা আমার বাল্যকালের শিক্ষক। ওইযে যার কথা বলছিলাম। আজকে পাইছি। খানাপিনার আয়োজন করো। আপ্যায়নে যাতে কমতি না হয়” !

বাবুর্চি চাপাতি টেবিলে রেখে দুই হাত উচিয়ে শুকদেবকে নমস্কার বলে চলে গেলো। ওয়েটারকে ডেকে বললাম, মামা দুই প্লেট গরুর কাচ্চি দাও…

শুক দেবকে দেখে বিচলিত মনে হচ্ছে। ইতোমধ্যেই সে ঘামতে শুরু করেছে। তার কপালে বিন্দু বিন্দু ঘাম। শালা বুঝতে পেরেছে আজকে তার কপালে শনি আছে। স্যারের এই বিপদের সময় আমার উচিত তার পাশে দাঁড়ানো।

আমি ঠান্ডা পানির গ্লাস হাতে নিয়ে স্যারের মুখে পানি ছুঁড়ে মারলাম।

“স্যার এখন ভালো লাগতেসে?”

শুক দেব তব্দা খেয়ে আমার দিকে তাকিয়ে রইলো। শালা অবাক হয়েছে। হাহাহা…

ওয়েটার কাচ্চি নিয়ে এসেছে। শুক দেব কাচ্চি খাবে কিনা ভাবছে। আমি কোনোদিকে না তাকিয়ে চুপচাপ খেয়ে যাচ্ছি। আড়চোখে তাকিয়ে লক্ষ্য করলাম, স্যার মাংস খাচ্ছেনা। মাংস একপাশে সাইড করে রেখে মাংসের ঝুল দিয়ে বিরানী খাচ্ছে…

আমি তার দিকে তাকিয়ে দাঁত কেলিয়ে বললাম, “ওটা কে খাবে?”

শুক দেব মাংসের টুকরোটি আমার প্লেটে উঠিয়ে দিয়ে বললো, বাবা তুমি খাও। তোমার স্বাস্থ্য বাড়ানোর দরকার আছে…

শুকদেবের উপস্থিত বুদ্ধি দেখে আমি অবাক হলাম। শালা বড়ই চতুর। আমাকে কথার ফাঁদে ফেলে প্রতারণা করতে চায় !! নিজেকে আর কন্ট্রোল করে রাখতে পারলাম না। টেবিলের তলা দিয়েই শুকদেবের ঝুনঝুনি বরাবর লাথি মারলাম। শুকদেব চেয়ার উল্টে মাটিতে লুটিয়ে পরলো। পেছন থেকে তিনজন ওয়েটার এগিয়ে এলো। হোটেলের সবচেয়ে কালো ওয়েটার ইউসুফকে বললাম, “ইউসুফ বোরহানি নিয়ে আয়” ।

ইউসুফ বোতলে করে বোরহানি নিয়ে এলো। শুক দেব স্যার চেয়ার সহ মাটিতে শুয়ে আছি। আমি স্যারের মুখে বোরহানি ঢেলে দিলাম। চশমার কারণে বোরহানি পুরোপুরিভাবে তার চোখে গেলো না। তবে থোঁতা বেয়ে সামান্য বোরহানি স্যারের চোখপর্যন্ত গিয়ে পৌঁছেছে। তবুও শালা চোখ খুলছে না। চোখ বন্ধ করে কুকোরের মত চেঁচাচ্ছে…

শুক দেবের চেঁচানি থামাতে বাবুর্চি মহিউদ্দীন শসা নিয়ে এগিয়ে এলো। আস্তা শসাটি খোসা সহ শুকদেবের মুখে ভরে দেয়া হলো। ভালো হয়েছে, এখন আর চিৎকার করতে পারবেনা…

আমি আর দেরি না করে শুকদেবের বুকের উপর উঠে এক পায়ে দাঁড়িয়ে পরলাম। আমার সাথে সাথে অন্যান্য ওয়েটাররাও শুকদেবের বুকে চড়ে এক পায়ে দাঁড়ালো। সবাই মিলে কিছুক্ষণ মুরগি মুরগি খেললাম। বেশ মজা হলো…

ততক্ষণে শুকদেব বমি করে দিয়েছে। তবে বোরহানির কারণে সেটা ভালোমত বোঝা গেলো না। শুকদেবকে উঠে বসানো হলো। শুক দেব আমাকে প্রশ্ন করলো –

– বাবা আমি কি করেসি? আমাকে মারসো কেনো?
– তোরে হুদাই মারুম। কি করবি?
– আমার অপরাধ কি?
– হুদাই ঘারামু তোরে। কি করবি?

এ কথা বলেই তার নাকেমুখে দুই হাত দিয়ে সপাত সপাত করে আরো কয়েকটি থাবড়া মেরে দিলাম। শুকদেব মার খেয়ে পাগল হয়ে গেছে হাহাহা। খুব ভালো লাগছে…

ওয়েটার বিল নিয়ে এসেছে। সাথে একবাটি ধনিয়া মশলা। সেখানে আবার কয়েকটা টুথপিকও আছে, দাঁত খোঁচানর কাঠি। আমি একটা টুথপিক উঠিয়ে নিয়ে শুকদেবের চোখে গুতা দেয়ার ভয় দেখালাম। শুকদেব ভয়ে কুঁকড়ে গেলো। বহুদিন পর মনের ঝাল মেটাতে পেরে খুব ভালো লাগছে…

শুক দেবকে বললাম, শালা বসে আছো কেনো? বিল দাও…

শুক দেব বিল পে করে উঠে যেতে চাইলো। সাথে সাথেই হোটেলের সব ওয়েটার চলে এলো। তারা বকশিশের জন্য শুকদেবের কাছে হাত পাতলো। শুক দেব মোট পনেরোজন ওয়েটারকে ১০ টাকা করে ১৫০ টাকা বকশিশ দিলো…

শুকদেবকে আজকে আর শিক্ষক মনে হচ্ছেনা। মনে হচ্ছে এ তো আমার ছোটকালের বন্ধু, ক্লোজ ফ্রেন্ড !

আমি শুকদেবের কাঁধে হাত দিয়ে বন্ধুসুলভ আচরণ করতে করতে দুজন একসাথে হোটেল থেকে বেরিয়ে এলাম। শুকদেবকে বললাম, তুমি না কফি খেতে চেয়েছিলে? চল বন্ধু কফি খাই…

শুকদেব ফাঁকা রাস্তা পেয়ে দৌঁড় দিয়ে পালিয়ে গেলো। হাহাহা। আমার দিকে আর ফিরেও তাকালোনা। আমি খুশিমনে হোটেলে ফিরে এসে বসলাম। জানি শুকদেব ফিরে আসবেই। কারণ হোটেলের টেবিলে যেই জিনিস সে ফেলে রেখে গেছে, ওইটা ছাড়া তার এক মুহুর্তও চলবেনা…

পানমসলা খেয়ে কৌটার ভেতর ছেপ দিয়ে রেখেছি। হোটেলের ম্যানেজারকে বলেছি, স্যার আসলে জিনিসটা ফেরত দিয়ে দিও…

Comments

comments