আগেকার সময় দান খয়রাত দিলে ভিক্ষুকরা দোয়া করতো। মাথায় হাত বুলিয়ে দেয়ার চেষ্টা করতো। নানান রকম মিষ্টি মিষ্টি কথা বলে খুশি করার চেষ্টা করতো। এখনকার ফকিররা ভিক্ষা নিয়েই দৌড় দেয়। আর পেছন ফিরে তাকায় না। ব্যাপারটা আমাকে কষ্ট দেয়। আমি দান খয়রাত দেই মানুষকে দেখানোর জন্য। আমি চাই, আমি খয়রাত দেয়ার পর ফকির বেটি আমার মাথায় হাত বুলিয়ে বলুক, বাবা তুমি অনেকদিন বেঁচে থাকো 143 🌹

কিন্তু তারা সেটা করেনা। তাই ইদানিং ভিক্ষা দেয়াও কমিয়ে দিয়েছি…

বিকাল ৪টা, অফিস থেকে বেরিয়ে নিচে দাঁড়িয়ে আছি। আশেপাশে কেউ নেই। ফাঁকা এলাকা। গুটি গুটি পায়ে ফাহমিদার বাবার বয়সী এক ফকির এগিয়ে আসছে আমার দিকে। আহারে বেচারা, দারিদ্রতার কষাঘাতে এই বৃদ্ধ বয়সেও রাস্তায় নেমে ভিক্ষা করতে হচ্ছে। লোকটাকে দেখে আমার মন গলে গেলো। এক টাকার কয়েনের জন্য পুরো মানিব্যাগ হাতড়ালাম। কিন্তু পেলাম না। যা আছে, সব দুই টাকার নোট…

– খয়রাত দেন বাবা।
– কি নাম তোমার?
– আবুল কালাম তরফদার মেন্টু
– খাইতে ভাত পাওনা। নাম রাখসো ৪টা। বাবাহ !
– খয়রাত দেন।
– ছেলে মেয়ে আছে?
– আছে
– কয়জন?
– ৩ ছেলে ২ মেয়ে।
– তোমাদের গরিবদের এই একটা সমস্যা। প্রটেকশন নিতে না পারলে এটলিস্ট পলিথিন নাও। সেটাও পারবানা তোমরা !
– খয়রাত দেন।
– এক টাকার কয়েন থাকলে দাও। আমার কাছে খুচরা নাই।

মেন্টু ফকির তার বাটি থেকে আমাকে ১ টাকার একটি কয়েন দিলো। আমি তাকে দুই টাকার একটা নরম নোট দিয়ে দিলাম। টাকাটা আর একদিন পকেটে থাকলে ছিঁড়েই যেত…

ভিক্ষা নিয়ে মেন্টু চলে যাচ্ছে। আমি তাকে পেছন থেকে ডাকলাম। “অ্যাঁই কাকা, দোয়া কইরা যাবানা?”

ফকিরের বাচ্চাটা হাত উঁচু করে দেখিয়ে বললো, “করসি করসি দোয়া করসি”।

কিন্তু আমি তার কথা বিশ্বাস করতে পারলাম না। ছোটবেলায় আনোয়ার স্যার বলেছিলো, শোনা কথায় কান দেয়া যাবে না। আমি কিভাবে মেন্টুকে বিশ্বাস করি?

আমি এবার পেছন থেকে দৌড়ে গিয়ে তার পাঞ্জাবীর ঘাড়ের কলার মুঠ করে ধরলাম।

“চাচা কই যাও। দোয়া তোমাকে করতেই হবে। জোরে জোরে দোয়া কইরা যাও। নিজকানে না শোনার আগে তো বিশ্বাস করবোনা।”

মেন্টু ভড়কে গেলো। তাকে আতংকিত দেখালো। একমুহুর্ত পর সে বলেই ফেললো, “দিসেন এক টাকা, আবার দোয়াও চান” !

মেন্টুর কথা শুনে আমি উত্তেজিত হয়ে গেলাম। তার কাঁধের ব্যাগ ধরে হ্যাঁচকা টান দিলাম। ব্যাগ ছিঁড়ে সব চাউল রাস্তার উপর ছড়িয়ে পরলো। মেন্টু হুংকার করে উঠলো। ওর মত ফকিরের এত বড় কলিজা, আমার সামনে সে হুংকার দেয় !

আমি তার সাথে ধস্তাধস্তি শুরু করলাম। পিটিয়ে মেন্টুর লুঙ্গি খুলে ফেললাম। মেন্টুর লুঙ্গি দিয়ে আমার জুতা মুছে তারপর লুঙ্গিটি ফিক্কা মেরে গাছের উপর তুলে দিলাম। মেন্টু তার হাতের আরএফএল প্লাস্টিকের বাটি দিয়ে নিজের সম্ভ্রম ঢাকলো। তাকে এখন পিকে’র মত লাগছে…

এক বুক হতাশা নিয়ে ঘরে ফিরে এলাম। টাকা দিয়েও দোয়া কেনা গেলো না…

আসলে এ দেশ থেকে আসতে মায়া মোহাব্বত ভালোবাসা উঠে গেছে। কেউ আর কাউকে মন থেকে ভালোবাসেনা। কেউ ঝোঁকে পরে ভালোবাসে। দুদিন পর একটা না একটা ইস্যু বানিয়ে নিজে থেকেই দুরে সরে যায়। এদেশে এগুলাই এখন চলছে…

Comments

comments