আমাদের চারতলার এক ফ্যামেলিতে সকাল থেকে খুব হইচই চলছে। এই পরিবারের প্রধান যে ব্যক্তি, দুই মেয়ে এক ছেলের বাবা, লোকটা ক্যান্সারে আক্রান্ত। তিনি সাতদিনের ভেতর মারা যাবেন। ডাক্তাররা নাকি আরো আগেই বলে দিয়েছে, একমাসের বেশি তাকে বাঁচানো যাবেনা। একমাস পর মারা যাবে। সেই একমাস পূর্ণ হতে আর মোটামুটি সাতদিন বাকি। এমনটাই জানলাম ম্যানেজারের কাছ থেকে…

জীবনের এই শেষসময়ে তার অনেক আত্মীয়রা বিভিন্ন জায়গা থেকে এসে হাজির হয়ে হয়েছে। কিছুক্ষণ আগে গ্রাম থেকেও দল বেধে এক গ্রুপ এসেছে। এরা সবাই উনার নিকট আত্মীয়। কষ্ট করে এতদুর আসার উদ্দেশ্য, শেষবারের মত একনজর দেখে তাকে বিদায় জানানো…

একজন মানুষ জেনে গেছে, সে সাতদিন পর মারা যাবে। একের পর এক আত্মীয়স্বজন এসে তাকে বিদায় জানিয়ে চলে যাচ্ছে। আর কখনোই এদের সাথে দেখা হবেনা। ব্যাপারটা মানতে উনার কেমন লাগছে, আমি জানিনা…

…একনজর দেখে আসতে গেছিলাম।

গিয়ে দেখি, আত্মীয়রা যখন বিদায় নিচ্ছে, লোকটা তখন হাত মেলাতে চাচ্ছে। প্রিয়জনদেরকে শেষবারের মত একটু ছুঁয়ে দেখার ভাগ্যটাও তার হচ্ছেনা। খুব সম্ভবত এরকম রোগীদের সংস্পর্শে কাউকে যেতে দেয়া হয়না।

দেখলাম, তার দুই মেয়ে আপেল কমলা বিতরণ করছে মেহমানদের মাঝে। ছেলে ট্রে ভর্তি চায়ের কাপ নিয়ে ঘরের মধ্যে ঘুরে বেড়াচ্ছে…

ড্রয়িং রুমে জায়গাজমি নিয়ে আলাপ করা একদল মুরব্বিও দেখা হলো। তারা ইনার তিন সন্তানের ভবিষ্যত নিয়ে খুব চিন্তাগ্রস্ত…

… বাসায় ফিরে এলাম

ভেবে দেখলাম, জীবনের একটা নির্দিষ্ট সময়ে গিয়ে সব মানুষরাই অসহায় হয়ে যায়। জীবন অনেকটা নিম্নমানের বাংলা সিনেমার মত। মৃত্যুর আগে গোলাম মোস্তফার অবশ হাতে নীল কালি লাগিয়ে হুমায়ুন ফরীদি যেভাবে সম্পত্তি নিয়ে যায়। ঠিক একই আচরণ প্রতিটা মৃত্যুপথযাত্রী ব্যক্তির সাথে বাস্তবজীবনেও করা হয়…

লোকটা হয়ত এইসময় চাচ্ছে, মেয়ে দুইটা তার মাথার পাশে বাকি সাতটা দিন বসে থাকুক। ছেলেটা দাঁড়িয়ে থাকুক মুখ বরাবর…

… মেয়ে দুইটা হয়ত প্লেট টানতে টানতেই বাবাকে হারিয়ে ফেলবে। বাবা হারানোর পর ছেলেটারও আর ভেঙে পরা হবেনা। চাচা জেঠাদের সাথে সাথে দৌড়াতে হবে মামলা মোকদ্দমা পর্যন্ত ! আমাদের দেশে এগুলাই হয়।

এদেশে ছেলেদের কর্মজীবন শুরু হয় বাবাকে হারানোর মাধ্যমে। আর মেয়েদের প্রকৃত সংসার জীবন শুরু হয় মা হারানোর পর…

Comments

comments