দারোয়ান সিদ্দিক বিএনপি করে। সে বিএনপির কট্টক সমর্থক। যদিও রাজনীতির কিছুই সে বুঝেনা। তবে বুঝার চেষ্টা করে। যখনই কেউ রাজনৈতিক আলাপ করে, সিদ্দিক তাদের পাশে গিয়ে পেছনে হাত গুটিয়ে দাঁড়িয়ে থাকে। মাথা নাড়ায়। দেখে মনে হয়, সে বিরাট সমাজবোদ্ধা। সব বুঝতেসে সে। এখন খালি ভবিষ্যতবাণী দেয়ার পালা…

জুম্মার নামাজের পর থেকেই এলাকায় মাইকিং করে গান বাজানো হচ্ছে – “মোল্লা ভাইয়ের সালাম নিন, নৌকা মার্কায় ভোট দিন”

গানটা ডিজে না হিপহপ, কিছুই বোঝা গেলোনা। শেষের দিকে আবার হেভি মেটাল মনে হইসে। খারাপ লাগেনি, তবে আরেকটু সুন্দর হতে পারত। কিছুটা অদক্ষতার ছাপ পাওয়া যায়…

এই গান শুরু হওয়ার পর থেকে সিদ্দিকের মাথা গরম হয়ে গেছে। সে হুদাই ফকির মিসকিনদের সাথে চিল্লাফাল্লা করতেসে। বাসার নিচে ছোট পোলাপান যাকে পাচ্ছে, তাকেই হুদাই দৌড়ানি দিচ্ছে। একটু আগে আবার চেয়ার দিয়ে কুত্তা পিটাইলো। জানাল দিয়ে সব দেখতেসি…

নিচে গিয়ে সিদ্দিককে জিজ্ঞেস করলাম, “কিরে কি হইসে? এমন লাগাইসস ক্যান?”

– মাথা গরম ভাই মাথা গরম। মাথা পুরাই একশ ছাব্বিশ।
– কি হইসে? খুলে বল
– খুতবা শুনতে মসজিদে গেলাম না। কানের কাছে এখন বাঁশি বাজাইতেছে। মেজাজ খারাপ হইবোনা?
– কে বাঁশি বাজায়?
– ওইযে আওয়ামীলীগের গান বাজাইতেসে যে।
– তাতে তোর কি সমস্যা?
– যন্ত্রণা লাগে
– তোর কিসের এত যন্ত্রণা। তুই হইলি ফকিরনির পোলা। তোরে কুত্তার হাড্ডি দিলে কুত্তার হাড্ডি খাবি। ছিঁড়া নোট দিলে ছিঁড়া নোট নিয়ে বাসায় যাবি। তোর এত যন্ত্রণা কিসের?
– ভাই এল্লাইগা ওগো গান শুনতে হইবো? যারা আওয়ামীলীগ করে, তাগোর বাসায় বাসায় গিয়া গান বাজায়া আসুক। ওপেনে বাজাইবে ক্যান? বিএনপিওয়ালারা কি তাগো কাছে গান শুনতে চাইসে?
– তুই তাইলে বিএনপি করস
– বিএনপি আমরা আইজকা থেকে করিনা ভাই। আমার আব্বার আব্বাগো থেকে শুরু। যুদ্ধের আগে থেকে বিএনপি করে তারা।
– তাই নাকি
– বিএনপির হইয়ে আমার আব্বারা যুদ্ধ করছিলো। আর কালো কইরা আমার যে চাচা আইসিলো না গতমাসে, হেয় যুদ্ধ করছিলো আওয়ামীলীগের হইয়া।
– কস কি ! তোরা তো তাইলে রাজ পরিবার। এই দুই দল যে যুদ্ধ করসে, সেটাই তো জানতাম না।
– পড়ালেখা কইরা সব জানা যায়না। আশেপাশে তাকায়া অনেক কিছু শিখতে হয়।
– তুই তো তাইলে অনেক কিছুই জানস রাজনীতির।
– জ্বি ভাই
– তাইলে বল, এইবার কে ক্ষমতায় আসবে?
– বিএনপি। হান্ড্রেডে হান্ড্রেড।
– এত শিওর কেমনে?
– আমি কইলাম আপনে দেইখেন, এইবার বিএনপি আইবো।
– বিএনপি আসলে তোগো প্রধানমন্ত্রী কে হবে?

এইবার সিদ্দিক থতবত খেয়ে গেলো। লুঙ্গি নাড়াচাড়া দিয়ে এদিক ওদিক তাকিয়ে উল্টা আমাকে জিজ্ঞেস করলো, “আপনের কি ধারণা? বিএনপি জিত্তা গেলে কারে প্রধানমন্ত্রী বানাবে?”

“কারে আবার? মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। তার নাতনী আমার ফলোয়ার। আমি তার কাছ থেকে শুনছি”

আমার কথা শুনে সিদ্দিকের চাপা আবারো শুরু হয়ে গেলো, “ভাই আমি এইটাই ভাবতেছিলাম। মির্জা ফখরুলই প্রধানমন্ত্রী। খালেদা জিয়া তো জেলটেল খাইটা ক্লান্ত হইয়া গেছে। হের এখন বিশ্রাম দরকার। ফখরুল সাবই প্রধানমন্ত্রী তাইলে” !

এই বোকাচোদার সাথে আরো কিছুক্ষণ বকবক করা যেত। ভালোই লাগতেসিলো তার রাজনৈতিক মতবাদ শুনতে। বিএনপি সমর্থকদের এই একটা জিনিস ভালো লাগে। তারা আশা হারায় না। পরপর দুইবার ক্ষমতা হারিয়ে এত ঝায়-ঝামেলার মধ্যে থেকেও তারা সাহস করে বলে, “ভাই দেইখেন, সরকার পল্টি খাবে। বিএনপি আসবে এইবার” !

আমরাও চাই বিএনপি আসুক। আমরা চাই, আওয়ামীলীগও আসুক। তবে কেউ আসুক আর না আসুক, এবারের নির্বাচন ঠিকই বাংলাদেশের ইতিহাসের অন্যতম ঐতিহাসিক নির্বাচন হয়ে থাকবে। প্রোফাইলে i hate politics লেখা এ প্রজন্মের একটা বড় অংশ এবার ভোট দিতে যাবে। দেখা যাক, তাদের রাজনৈতিক দুরদর্শিতা কতদুর। দেখা যাক, তারা কাকে বেছে নেয়…

ততদিন পর্যন্ত আমরা গান শুনি থাকি। বিএনপি, জাতীয় পার্টিরও কিছু গান বের হওয়া দরকার ছিলো। মিলায়ে ঝিলায়ে শুনতে ভাল্লাগতো। এক গান তো আর একটানা বেশিদিন শোনা যায় না…

তাই না?

Comments

comments