বাচ্চাটা ঘুমাচ্ছে। আমি তার বুকের উপর বসুন্ধরা এলপি গ্যাসের সিলিন্ডার তুলে রেখে দিলাম। এখন আর গড়াতে গড়াতে খাট থেকে পরে যাবার ভয় নেই। শূয়রটাকে রেখে নিশ্চিন্তে বাইরে থেকে ঘুরে আসা যায়। একটা সিগারেট খাওয়া দরকার…

স্পেন থেকে খালাত ভাই নিজাম বউবাচ্চা নিয়ে দেশে ফিরেছে। এইটা তারই বাচ্চা, আমার না। আমি বিয়ে করিনি :—)

নিজাম কিছুদিন ঢাকায় বেড়াবে। আমাকে দুদিন আগে ফোন করে বলে রেখেছিলো, যাতে এয়ারপোর্ট গিয়ে ওদেরকে রিসিভ করে নিয়ে আসি। রাজি হলাম। এই রাজি হওয়াটাই ছিলো ২০১৮ সালের সবচেয়ে বড় ভুল। ঢাকা শহরে এত আত্মীয় থাকতে আমার বাসাটাই তার চোখে পরলো। এখন নাকি নির্বাচনের আগে আর বাড়িতে যাবেনা। আমার এখানে থেকেই বিশ দিনের ছুটি কাটিয়ে দিবে। এইটা কোনো কথা?

বিদেশ থেকে মানুষ মোবাইল আনে, ক্যামেরা আনে, বস্তা ভরে চকলেট আনে, আরো কতকিছু আনে। নিজাম আমার জন্য শ্যাম্পু এনেছে। তাও আবার ডাভ শ্যাম্পু…

শ্যাম্পু যখন আনসস, সাথে একটা ফেসিয়াল টিস্যুর বক্সও আনতি। এখন শ্যাম্পু মেখে কোথায় মুছবো, যদি গোসল করার সময় পানি চলে যায়। গামছা দিয়ে কি আর সবকিছু মুছা যায়?

নিজামের বাচ্চাটা দেখতে নিজামের মত হয়নি। আমার ধারণা, এটা নিয়ে নিজামের মনে একটা ক্ষোভ আছে। এজন্যই বাচ্চাকে ঘুমে রেখে বউ নিয়ে ঘুরতে গেছে। বাচ্চাটার মুখের দিকে তাকিয়ে আমার মায়া হলো। কি মায়াবী চেহারা…

ছোট বাচ্চাদেরকে একা ঘুমে রেখে ঘর থেকে বেরোতে নেই। গড়াগড়ি করে খাট থেকে পরে যায়। তাই ওর বুকের উপর গ্যাসের সিলিন্ডার রেখে এসেছি…

নিচে নেমে দেখি, আমাদের কেয়ারটেকার মোজাম্মেল ফিরে এসেছে। দারোয়ান সিদ্দিকের সাথে বসে বসে কথা বলছে। আমাকে দেখামাত্রই মোজাম্মেল উল্টাদিকে দৌড় দিলো। কিন্তু বাড়ি থেকে বের হতে পারলোনা। উল্টাদিকে দৌড় দিলে কিভাবে বের হবে? গেট তো ছিলো তার পেছনে…

আমি সিদ্দিককে ইশারা করলাম। সে মেইনগেট বন্ধ করে দিলো। মোজাম্মেল দৌড়াতে দৌড়াতে বাড়ির চারপাশ চক্কর দিয়ে আগের জায়গায় চলে এসেছে। সে এখন আমার মুখোমুখি…

– কিরে মোজাম্মেল, ভয় পেলি নাকি?
– না স্যার। এমনিই একটু দৌড় দিলাম। হাত পা শিনশিন করতেসিলো। কেমন আছেন স্যার?
– ভালো আছি
– স্যার আমারে মাফ কইরা দেন। না বইলা পালায়া গেছিলাম। ভুল হইসে
– আরে ব্যাপার নাহ। পালায়াই তো গেসস। বেতন তো আর নেস নাই। বেতন ছাড়াই যে পাঁচমাস খাটসস, এটাই বা কম কিসে !
– ভাই লজ্জা দিয়েন না। আমি কাজ করুম ভাই । আমারে আবারো কেয়ারটেকার নেন।

সিদ্দিক কথার মাঝখানে এসে ব্যাঘাত ঘটালো – “কেয়ারটেকার লাগবোনা। আমি একাই সামলাইতে পারি। আলগা লোক রাখার দরকার নাই” !

আমি সিদ্দিদের পেটে একটি লাথি দিলাম। সাদা শার্টে জুতার ছাপ বসে গেলো। ব্যথা পেয়ে সিদ্দিক তার টুলে গিয়ে বসে পরলো। আর কোনো কথা বললো না…

তত্বাবধায়ক সরকার ইংরেজি কেয়ারটেকার গভঃমেন্ট, এটা জানার পরপরই সিদ্দিক নিজেকে কেয়ারটেকার ভাবা করা শুরু করেছে। এলাকার দোকানদারদের কাছে শুনেছি, সে নাকি সবাইকে বলে বেড়ায়, সে এই বাড়ির কেয়ারটেকার। বাড়িতে তার সিদ্ধান্তই চুড়ান্ত সিদ্ধান্ত…

আজকে লাথি খেয়ে ওর শিক্ষা হয়েছে। আমি মোজাম্মেলকে কেয়ারটেকারের পদ ফিরিয়ে দিলাম। আজকে থেকে সে এখানেই থাকবে। সিদ্দিকের উপর থেকে চাপ কিছুটা কমলো। বুয়ার হয়ত একটু কষ্ট হয়ে যাবে…

নিজাম চলে এসেছে। আমাকে নিচে দেখে সে শঙ্কিত…

– ভাই আপনি নিচে। বাবু কই?
– ঘুমাচ্ছে :—)
– একা বাসায় রাইখা আসছেন বাচ্চাটারে?
– সিস্টেম করেই রেখে আসছি। টেনশন নিওনা। নাও, সিগারেট খাও।
– চাবি দেন ভাই

নিজামের দুইহাত ভর্তি শপিংয়ের ব্যাগ। জিজ্ঞেস করলাম, “চাবি কিভাবে দিবো? হাত ভর্তি তো ব্যাগ আর ব্যাগ”

“শার্টের পকেটে ঢুকায় দেন”

আমি নিজামের স্ত্রীর শার্টের পকেটে চাবি রাখার জন্য হাত বাড়ালাম। সে দেড়হাত দুরে সরে গেলো। বিদেশি মেয়ে, তাই হয়ত নিজামের বাংলা কথা বুঝতে পারেনি :—)

বাধ্য হয়ে আমি নিজামের পকেটে চাবি ঢুকিয়ে দিলাম। বউ নিয়ে নিজাম উপরে চলে গেলো। আমি মেইনগেটের বাইরে চলে এসেছি…

এবারের শীতটা কমবেশ সবারই খারাপ যাবে বলে মনে হচ্ছে। নির্বাচনের বাজারে ঝামেলা এড়াতে প্রশাসন বেশ তৎপর। রাস্তার মোড়ে ভাপাপিঠা নিয়ে বসা মহিলাগুলোকে এবার আর দেখা যাচ্ছেনা। নির্বাচনের সময় কর্পোরেটরা টাকা ছাড়েনা। সব টাকা খরচ হয় নেতাদের পেছনে। এই একমাস মানুষের বেতন আটকে থাকবে। অনেকেরই এই শীতে সোয়েটার কেনা হবেনা। যদিও এতদিনে কমলাপুরে বেশ কয়েকবার শীতবস্ত্র বিতরণ করা হয়েও গেছে। ফেসবুকের ইভেন্টগুলো দেখে সেরকমটাই জানা যায়…

🌸 জীবন এখন ফেসবুক নির্ভর। গত শীতে এই সময়টা যার সাথে কাটিয়েছি, এবারের শীতের এই সময়টা সে হয়ত অন্য কারো সাথে কাটাবে। কিছু তো করার নাই। সময় যেহেতু আছে, কিছু একটা করে কাটাতে তো হবেই !

🌸 যার সাথে কাটিয়েছি বলতে আমি “সোয়েটার” এর কথা বলছি। আমার নীল সোয়েটাররা এখন আমার কাছে নেই। চুরি হয়ে চলে গিয়েছে অন্য কারো গায়ে…

… নিজামের টেক্সট আসছে, “ভাইয়া আমরা চলে যাচ্ছি। চাবি দিয়ে গেলাম মোজাম্মেলের কাছে। ভালো থেকো !”

বুঝলাম না নিজাম হুট করে কেনো চলে যাচ্ছে। চাবিটাই বা কেনো সিদ্দিকের কাছে না দিয়ে নবাগত মোজাম্মেলের কাছে দিলো ! মোজাম্মেল বোধহয় ফর্মে ফিরে এসেছে…

মোজাম্মেলের আছে জল 💭

Comments

comments