কারো সাথে প্রথম সাক্ষাতের কথা আমি মনে রাখতে পারিনা। কারণ অনেক মানুষের সাথেই আমাকে চলাফেরা করতে হয়। তবে জীবনের বিশেষ কিছু সময়ে এমন কিছু বিশেষ মানুষ এসেছিলো, যাদেরকে আমি কখনোই ‘অনেক মানুষ’ এর তালিকায় ফেলতে পারিনি। তেমনই একজন হচ্ছে মৃন্ময়, সম্পর্কে আমার ফেসবুকীয় ছোটভাই…

এই ছেলেটা আমাকে ফলো করত ২০০৯ থেকে। তখন সে চন্দ্রাহত মৃন্ময় নামে একটা আইডি চালাত। পোস্টে নিয়মিত তার এক্টিভিটি চোখে পরত। আমি তখন ফেসবুকে কারো সাথে কথা বলতাম না। কমেন্টের রিপ্লাই দেয়া তো দুরের কথা, কারো ম্যাসেজ পর্যন্ত পড়তাম না। তাই যারা আমাকে পছন্দ করত বা আমার আশেপাশে থাকতে চাইত, তারা আমার ছোটভাইদের সাথে আগে খাতির করত। দুয়েকবছর ঘুরেফিরে তারপর দেখা করার টিকেট পেত…

…মৃন্ময়ও বোধহয় সে কাজটাই করেছিলো। সে আমার ছোটভাইদের বন্ধু, এটা জানতে পেরেছিলাম কুয়াশা এবং সাদিকুলের কাছে। ওরা মেবি তখন একসাথে টিএসসি আর হাতিরঝিলে গিয়ে আড্ডা দিত। সবাই মিলে মৃন্ময়ের নাম দিয়েছিলো ‘নেংট্যু কবি’ !

সে বছর আমার হাত খালি। টাকাপয়সা খুব একটা নেই। শপিংয়ে যাবো। কুয়াশারও হাত খালি। তার আম্মা তখন চিকিৎসা নিতে অস্ট্রেলিয়াতে। আমি কুয়াশাকে বললাম, ‘চলো ঈদের কেনাকাটা করে আসি।’

সে বললো, ‘আপনি যান ভাই। আমার শরীরটা ভালো না। আপনি নেংট্যু কবিরে নিয়ে যান।’

বুঝলাম তার হাত খালি। ঈদে আমি নতুন কাপড় পরবো, সে পরবেনা। তা তো হতে পারেনা। জানি, জোরাজুরি করে লাভ নেই। সে যাবে না। তাই আমি তার বন্ধু মৃন্ময়কে নিয়েই শপিংয়ে যাবার সিদ্ধান্ত নিলাম…

ঘটনাসুত্রে মৃন্ময়ের সাথে আমার দেখা হয়ে গেলো। ২০১২ বা ১৩ সালে, রমজান মাসের এক বিকেলে…

তার সাথে আমার প্রথম দেখা হয় কারওয়ান বাজার। সেখান থেকে আমরা নিউমার্কেট যাই, ধানমন্ডি যাই। কেনাকাটা শেষে ফার্মগেটে ফিরে এসে কারওয়ান বাজার রেললাইন ধরে হাঁটতে থাকি। হাতভর্তি শপিংব্যাগ, পকেটে টাকাপয়সা আর খুব একটা নেই। দুজনের পকেটে তিনটা মোবাইল, আর সব মিলিয়ে আড়াইশ টাকা হবে বোধহয়…

… এরইমধ্যে রেললাইনের শেষ মাথায় এক লোক এসে আমাদেরকে ডেকে থামালো। আমি খেয়াল করেছিলাম সে অনেকক্ষণ যাবৎ আমাদের পিছেই হাঁটছিলো। ডাক শুনে দাঁড়ানোর পর টের পেলাম সে আমার পিঠে ছুরি টাইপের কিছু ঠেকিয়ে কাঁধে হাত রেখেছে। মৃন্ময়ের ওপাশেও আরেকজন !

“হাঁটা থামাইস না। হাইসা হাইসা কথা ক। আমরা তোর বন্ধু”

আমি বললাম, জ্বি আপনি আমার বন্ধু

“ফোন বাইর কর। হাঁটতে হাঁটতে সিম খুইলা ঢাকনা লাগায়া ফোনটা হাতে ল। মানিব্যাগ বাইর কর। ভোটার আইডিকার্ড রাইখা বাকি সব ডাইনহাতে ল”

মানিব্যাগ বের করে বললাম, হ্যাঁ বন্ধু নিসি। এখন কি করবো?

ততক্ষণে আমরা মেইনরোডে চলে এসেছি। মৃন্ময়্ ছিনতাইকারীকে বললো, “ভাই আমাদের কাছে তো ভাড়া নাই। যাতায়াত ভাড়া আর নাস্তা বাবদ ১০০টা টাকা কি দেয়া যায়না?”

ছিনতাইকারী তাকে ১০০ টাকা দিয়ে দিলো !

এ কথাটা আমি শুনতে পাইনি। আমি তখন ভাবছি, ছিনতাইকারী হারামজাদা কখন ছুরি সরাবে আর আমি কখন অ্যাকশনে যাবো।

বাসের গেট পর্যন্ত পৌঁছেই ছিনতাইকারী দুজন আমাদের ছেড়ে দিয়ে পাশ কেটে যেতে লাগলো। মাতুব্বরি করে আমি পেছনে ফিরে একজনকে ল্যাঙ মারতে গেলাম। কপাল ভালো না হইলে যা হয়, পা বাড়ি খেলো রিকশার চাকার সাথে !

এখানেই শেষ না। রিকশার চাকায় বাড়ি খেয়ে পেছনের সিএনজির সাথেও বুকে গুতা খেলাম। কপাল ভালো বাসের হেল্পার আর মৃন্ময়্ দুজন মিলে পেছন থেকে আমাকে টেনে বাসে উঠিয়েছে। নাহলে বাসের চাকার নিচেই চলে যেতে হত ! ঘটনার আকস্মিকতায় আমিও বিস্মিত। বুঝলাম, সিনেমা আর বাস্তবতা এক নয়। এইসব হিরোগিরি এখানে চলেনা…

… আমি, কুয়াশা আর মৃন্ময়, খুব মন খারাপ করে একটা ঈদ কাটালাম। মৃন্ময়্ আর আমি, আমরা দুজনেই সকালে পুরনো পাঞ্জাবী গায়ে দিয়ে ঈদের নামাজ পরে কুয়াশার বাসায় চলে গেলাম। তারপর সেখানেই দিন পার। নতুন কিছু পরলে তিনজনে একসাথে ঘুরতে বের হতাম। ভালো লাগত। তবে রুমে বসে আড্ডা দিয়েও খুব একটা খারাপ সময় কাটেনি। এটলিস্ট আমরা চেষ্টা তো করেছি একজন আরেকজনকে খুশি করার, সবাই একসাথে ভালো থাকার !

চাইলে বাসা থেকে টাকা নিয়ে আবারো শপিং করা যেত। ইচ্ছে হয়নি। ঈদের বাজারে কি বাবার কাছে বারবার টাকা চাওয়া যায়? যে মানুষটা নিজেই টাকা বাঁচাতে এক পাঞ্জাবী চারবছর পরে, তার কাছে কিভাবে বারবার টাকা চাই?

যাই হোক, রমজান মাসের সেই দিনটা থেকে আমাদের মধ্যে একটা আত্মিক সম্পর্ক হয়ে গেছে। যদিও মৃন্ময়ের সাথে আমি খুব একটা ঘনিষ্ঠ ছিলাম না কখনোই। তবে আমাকে না জানিয়ে তার মালয়েশিয়া চলে যাবার খবরটা আমাকে বেশ কষ্ট দিয়েছিলো। যেভাবেই হোক, খবর পেয়েছিলাম। দেরি না করে সাথে সাথে ফোন দিলাম।

– তুমি আমাকে না জানিয়ে চলে যাচ্ছো মৃন্ময়?
– ভাই আপনি তো একবছর যাবৎ নিখোঁজ। আপনাকে কই পাবো আমি? মনে মনে তো গত একঘন্টায় একশ বার ভেবে ফেলেছি আপনার কথা। আমার জন্য দোয়া কইরেন ভাই।
– করবো

সেই থেকে আজ ৪ ফেব্রুয়ারী ২০১৯ তারিখ পর্যন্ত তিনটা বছর পেরিয়ে গেছে। আর দেখা হয়নি। আমি এরমধ্যে একবার মালয়েশিয়া গিয়েছিলাম শুধু তার সাথে দেখা করতে। এনওসি পেপার এক্সেপ্টেবল মনে না হওয়ার কারণে ইমিগ্রেশন থেকে আমাকে বাংলাদেশে ফেরত পাঠিয়ে দেয়। আর কয়েকটা মিনিট সামনে আগালেই চোখের দেখাটা হয়ে যেতে পারত। হলো না…

এতকিছু বলার কারণ হচ্ছে, আজ মৃন্ময়ের জন্মদিন। প্রতিবছর আমার জন্মদিনে আমি সবার কাছ থেকে পালিয়ে বেড়ালেও মৃন্ময় সহ আমার ফেসবুকের ছোটভাইব্রাদার গুলা ঠিকই শুভেচ্ছাবার্তা লিখে পোস্ট দিয়ে নিউজফিড গরম করে বেড়ায়। তাদের জন্মদিনে আমি আমার জীবন থেকে গুরুত্বপূর্ণ দুইটা ঘন্টা ব্যয় করে তাদের নিয়ে দুকলম লিখবোনা, স্মৃতিচারণ করবোনা, তা কি হয়?

মৃন্ময়ের আজকের দিনটা শুভ হোক। সবাইকে ছেড়ে দেশের বাইরে একা এই দিনটা সে কিভাবে কাটাচ্ছে, তার কেমন লাগছে, এসব অনুভূতি আমার জানা নেই। তবে এটুকু বুঝি, আমার কারণে ওদেরকে প্রায়ই অনেক ঝামেলা হয়। আমার হেটার্সরা আমার ক্ষতি করতে না পেরে সবার আগে অরিত্র, ইবু, মৃন্ময়দেরকেই রিপোর্ট দেয়। গত একবছরে আমার কারণে মৃন্ময়্ ছেলেটার তিনটা আইডি নষ্ট হলো। এসব কারণে আমার নিজেরও মাঝেমাঝে ওকে ইনবক্সে ছোট্ট করে বলতে ইচ্ছে হয়, ‘ভাই আমি লজ্জিত। আমার সাপোর্ট দিতে গিয়ে অযথা এত পেইন নিচ্ছো !’

…কিন্তু আমি বলিনা

বলিনা কারণ, বয়সে আমরা মোটামুটি একই এজের হলেও একা আমাকে বড়ভাই ভাবে। আর এই “বড়ভাই” হিসেবে আমার সম্মানটা আমাকে খুব অনিচ্ছা স্বত্বেও ধরে রাখতে হয়। কোনো কারণ ছাড়াই এত সম্মান পেয়ে কেইবা সেটা হারাতে চাইবে বলুন !

মৃন্ময়ের জন্মদিন শুভ হোক 🌸💭

Comments

comments