আগে অনেক উদ্দ্যেশহীন ভাবনা ছিলো। অনেক উচ্চবিলাসী স্বপ্নও ছিলো। সবটাই ছিলো দেশকে নিয়ে। এখন স্বপ্ন দেখা ভুলে গেছি। তবে এখনো কিছুটা ভাবি। আজ দুপুরে বসে ছিলাম গুলিস্তানের এক টংয়ে। চায়ের ছোট্ট কাপ হাতে নিয়ে মেঘলা আকাশ দেখছিলাম। মাঝে মাঝে খুব মেঘলা দিনে নিজেকে অন্যরকম করে ভাবতে ইচ্ছে করে। যেমন তখন ভাবছিলাম। রংচটা চায়ের কাপে কখন চা ঠান্ডা হয়ে থকথকে এক স্তর জমেছে খেয়ালই করিনি। হঠাৎ একটা কর্কশ শব্দে ধ্যান ভাঙ্গলো। পাশে তাকিয়ে দেখলাম এক বালক, হাতে ছেঁড়া বস্তা। পরনে কিবা আছে তা নাইবা বলি…

ছেলেটা আবার কর্কশ গলায় বললো, “ওই মিয়া পা সরান। কাগজ লমু”।

আমি ছেলেটার দিকে তাকিয়ে ছিলাম। নিশব্দে পা সড়িয়ে দিলাম। ছেলেটা কিছু ছেড়া কাগজ খুঁজে নিলো। ভেবেছিলাম ছেলেটা চলে যাবে আমি আবার উদ্দ্যেশ্যহীন সেজে ভাবতে বসবো। কিন্তু ছেলেটা উঠলো না। আশেপাশে ছড়ানো ছেটানো ভেজা কাগজগুলোকে একসাথে করছিলো সে। আমি তাকিয়ে তাকিয়ে তার সেই কাজের কারণ উদ্ধারের চেষ্টায় ছিলাম। কাজ শেষ করে উঠে যাচ্ছিলো ছেলেটা। তাকে পেছন থেকে ডাকলাম…

– ওই পিচ্চি!

– পিচ্চি কইয়েন না। আর কয় বছর পর বিয়া করতে পারুম।

– বিয়ে করবি মানে?

– হ বিয়া করুম। শুনেন নাই সরকারে বিয়ার বয়স কমাইসে?

– তুই কিভাবে জানলি?

– জানসি পেপার পইরা। ক্যা আপনে পড়েন না?

উত্তরটা নিয়ে আমি বেশ শঙ্কায় আছি। পেপার? মানে পত্রিকা! আমি পড়ি এই পত্রিকা? যে পত্রিকায় ব্যক্তি দলের খবরে ভরপুর সেই খবর কেনোই বা জানবো আমি? সেই পেপারে কি ‘দেশ’ কেমন আছে তার উত্তর আছে? নাহ ! নেই…

আমি আমতো আমতো ভাবে বললাম….

– হুঁ পড়ি তো।

– এবার কন ডাকসেন ক্যা?

– হুম। তুই ভেজা কাগজ এভাবে জড়ো করলি ক্যান ভাই?

– দ্যাশ প্রেম দ্যাশ প্রেম। বুঝলেন? আপনেগো মতো মাইনষে কাম শেষে কাগজডি ফালায় যায়। আর আমরা এডিরে সরাই। আপনেরা তো নিজেগো লইয়াই ব্যস্ত। রাস্তাটা দেখতে কেমন লাগে হেডি ভাবেন?

– তুই এতো কথা কইথ্যেকে শিখলি?

– এডি শিখতে হইবো ক্যা? বউরে ক্যামনে চুদবেন ওইডা কি শিখা লন?

– যা দূর হ। তুই বেয়াদপ।

নাহ, ছেলেটা আসলে বেয়াদব নয়। তবে তার দায়িত্ববোধ আমার শরীরে বিষের মতো জ্বলছে। একটা টোকাইয়ের কাছে শিখতে হবে দেশের প্রতি দায়িত্বজ্ঞ‍ান। ভাবতেই লজ্জা পাই…

আর ভাবার সময় নেই। চায়ের কাপটা রেখেই দুটো চিপস, একটা পেপসি আর দুটো সিগারেট নিয়ে একটা রিকশায় উঠলাম। হুড খোলা রিকশায় চিপস খেতে খেতে ব‍ৃষ্টিতে ভিজবো আজ সন্ধ্যা পর্যন্ত। মাঝে মাঝে জীবনকে নতুন করে উপভোগ করতে হয়। যেমন বৃষ্টিতে ভিজে চিপসে কামড় দিয়ে রিকশায় চড়া। আর অনাকাঙ্খিত কিছু ঝাঁকুনি। কারণ আমাদের শহরটাই একটা রোলার কোস্টার রাইড। যেখানে আমাদের নিয়ে ভাবার কেউ নেই, সেখানে রাস্তা তো… !

… ওকে !

এখন বর্তমানে আছি। গত আধা ঘন্টা যাবৎ রাস্তার চিপায় চিপায় চোখ ডুবিয়ে রেখেছিলাম। না কোনো রং মাখা শরীর খুঁজছিলাম না। খুঁজছিলাম একটা সাধারন ডাস্টবিন ক্যাণ। সত্যি বলছি পাইনি। চিপসের খালি প্যাকেটটা ফেলতে পারছিনা। রাস্তায় ফেলার চেষ্টা করছি। কিন্তু ফেলতে গেলেই ওই ছেলেটার কথা মনে আসছে। মনে হয় একটা টোকাইয়ের কাছে হেরে যাচ্ছি…

এখন আমি সায়দাবাদ ফ্লাইওভারের নিচে। হাতে একটা খালি বোতল, চিপসের খালি প্যাকেট আর তাতে দুটো মালবোরো সিগারেটের বাড। মাথার উপর দিয়ে আস্ত একটা ফ্লাইওভার। সেখান থেকে কয়েকটা পলিথিন নিচে উড়ে আসছে। সামনে একটা ভাঙ্গা রাস্তা। পানিতে প্রায় তাকে চেনা অসম্ভব। মনে হচ্ছে যেনো, “তুমি নও ব্যস্ত শহরের কোন রাজপথ। যেনো এক সুইমিং পুল” !

অনলাইনে কাজী নিপু এক নেগেটিভ চরিত্র। বলা যায় এক ভিলেন। নতুন কোন ভিলেন অনলাইনে আসতে চাইলেই তাদেরকে আমার সাথে তুলনা করে। তাদের দোষ থাকলেও লোকে তাদের মেনে নেয় এই ভেবে, “সে তো কাজী নিপুর চেয়ে ভালো”। এখানে আমি ত‍ুলনার বস্তু। আর যদি ভালো চরিত্র হয়, তাহলে তুলনা করা হয় কথিত সুশীল সমাজের চিহ্নিত ভদ্রলোকদের সাথে ! তেমনি আমাদের দেশটাও অন্য দেশের কাছে তুলনার বস্তু। তারা তাদের ব্যর্থতা ঢাকতে চায় আমাদের সাথে তুলনা করে।

আমরা কেনো কারো ব্যর্থতার তুলনা হবো? আমরা কি ভালোর তুলনা হতে পারিনা? আমরা কি কোনদিন গর্ব করে বলতে পারবো না আমাদের দেশের এই জিনিসটা সব দেশের চাইতে ভালো? পারবো কোনদিন বলতে?

আশা দেখিনা, আশা করিনা। শুধু দেখছি পৃথিবীর সবচাইতে স্বার্থপর জাতি। আশা করছি পৃথিবীর সবচাইতে মন্দ হওয়ার। যার পিঞ্চ লাইন হবে –

“মাথার উপরে ফ্লাইওভার, তাহার নিচে নদী

তাহার উপর পাইনা খুঁজে, ডাস্টবিনের ছবি

আহা আমার ডিজিটাল দেশ খুবই…”

Comments

comments