বৃষ্টির সময় ঢাকা শহরের ভিক্ষুকরা কোথায় হারিয়ে যায়, এটা একটা অমিমাংসিত রহস্য। আমি যে জায়গায় থাকি, এখানকার রাস্তায় সারাদিনে প্রায় হাজারখানেক ভিক্ষুক দেখি। বৃষ্টির সময় হঠাৎ করেই এরা উধাও হয়ে যায়। পথচারীদের মত হুড়োহুড়ি করে কার্নিশওয়ালা বাড়ি খুঁজে না ! ব্যাপারটা একেবারে মৃত পাখির মত। পাখিরা সাধারণত আগে থেকেই তাদের মৃত্যু সম্পর্কে টের পেয়ে যায়। মারা যাবার আগে তারা যত দ্রুত সম্ভব, লোকালয় ছাড়ে। কিন্তু কোথায় গিয়ে তারা মারা যায়, তা আজো অজানা।

বৃষ্টি হচ্ছে, রাস্তায় এক ফকির শুয়ে আছে। তার হাত পা নেই। হাত একটা অবশ্য আছে। কিন্তু অনেক চিকন। এই হাত দিয়ে সে কিছুই করতে পারবেনা। একারণেই এই ঝুম বৃষ্টিতে রাস্তার মাঝে শুয়ে আছে। পাশে নীল রংয়ের একটি বাটি। বাটিতে রাখা বেশ কয়েকটি নোট। তারমধ্যে একশো টাকার একটি নোট চকচক করছে। আমি ছাতা হাতে এগিয়ে গেলাম।

– কষ্ট হচ্ছে বন্ধু?
– মম মমম মম

লোকটি শুধু শারীরিক প্রতিবন্ধীই না, একই সাথে বাক প্রতিবন্ধী, মানে বোবা। আমি ছাতা কাঁধে চেপে ধরে তার নীল রঙয়ের বাটিটা হাতে নিয়ে টাকা গুনতে শুরু করলাম। কয়েন বাদে মোট দুইশত ছাব্বিশ টাকা রয়েছে। বেশিরভাগ নোটই ভিজে গেছে। এখানে পরে থাকলে একশো টাকার নোটটাও ভিজে যাবে। তাই আমি নোটটি পকেটে নিয়ে চলে আসলাম। আড়চোখে পেছনে তাকিয়ে দেখলাম, ভিক্ষুকের চিকন হাতটি নড়ছে।

বাসার নিচে দাঁড়িয়ে আছি। বৃষ্টির সময় নানান রকমের অদ্ভুত অদ্ভুত পোকার দেখা পাওয়া যায়। এরকমই একটি অদ্ভুত পোকা দারোয়ানের ঘাড়ে বসে আছে। আমি খুব আস্তে আস্তে সগোপনে এগিয়ে গেলাম। যাতে পোকাটি উড়ে না যায়। দারোয়ানের পিছনে গিয়ে সেন্ডেল দিয়ে পোকাটির গায়ে আঘাত করলাম। জুতার বাড়ি খেয়ে দারোয়ান ভড়কে উঠলো। সে ভয় পেয়ে বাড়ির গেট ছেড়ে দৌড়াতে দৌড়াতে বৃষ্টির মধ্যেই পালিয়ে গেলো…

ভয় মানুষের সবচেয়ে বড় শত্রু। ভয় করলেই ভয়। কালকে কে যেনো বলছি সে বিচ্ছু দেখলে ভয় পায়। অথচ রাঙ্গামাটি গিয়ে আমি মজা করে বিচ্ছু খেয়েছি। তেলে ভাজা মচমচে নোনতা বিচ্ছু খেতে ভালোই লেগেছে। একদমই পোকা মনে হয়নি। পোকার চিন্তা করলে সবার আগে গোরস্থানের কথা মাথায় আসে। শহরে জায়গা স্বল্পতার কারণে অনেক গোরস্থানেই পুরনো কবর খুঁড়ে নতুন লাশ নামানো হয়। এসব কবরে নানান রকমের অদ্ভুত সব পোকার সন্ধান পাওয়া যায়…

ভেবে দেখলাম, মানুষের গোরস্থানই পৃথিবীর সবচেয়ে বড় ম্যানগ্রোভ ফরেস্ট। কারণ এসব জায়গায় কারো গাছ লাগানো লাগেনা। আপনাআপনিই গাছ জন্মে যায়। খুব সম্ভবত মানুষের পঁচাগলা দেহ এই গাছ জন্মানোর কাজে সহায়তা করে। সে হিসেবে অ্যামাজনকে বলা উচিত মৃত সভ্যতার ফরেস্ট।

বিখ্যাত লেখক বোরিস পাস্তেরনাকের ‘ডক্টর জিভাগো’ উপন্যাসটি আমার পড়া হয়নি। কোন একটা বইতে যেনো পড়েছি, এই উপন্যাসে নাকি মৃতদেহ সমাধিস্থ করার সুন্দর বর্ণনা আছে…

“ঝড় বৃষ্টির মধ্যে মৃতদেহ কবরে নামানো হল। কবরে কয়েকটা জীবন্ত ব্যাঙ। ব্যাঙ সহই লাশটি মাটিচাপা দেয়া হলো। মৃত ব্যক্তির বাচ্চা মেয়ে দৃশ্যটি দেখছে, তার মাথায় ঘুরছে শুধুই জীবন্ত ব্যাঙগুলির কথা।”

Comments

comments