সকাল দশটা,

গুলশান ক্রিস্টাল প্যালেসের সামনে বসে আছি। সী ফুড খাবো। হাঙ্গর মাছ, ডলফিন, নীল তিমি দিয়ে ব্রেকফাস্ট করবো। রেস্টুরেন্টটা এখনো খুলেনি। তাই সামনের সিড়িতে বসে আছি। আমার শার্টের সাথে এই রেস্টুরেন্টের ক্লিনারদের ইউনিফর্মের কালার মিলে গেছে। হাহাহা…

সিড়িতে বসে বসে উদাস ভঙ্গিতে মুঠোফোন টিপছি। আচমকা কে যেনো পেছন থেকে এসে আমার পিঠে লাথি দিবো। আমি উপুড় হয়ে গড়াতে গড়াতে সিড়ির কয়েক ধাপ নিচে চলে গেলাম। মোটাসোটা বিশালদেহী এক লোক পাইপওয়ালা ঝাড়ু নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। লোকটি আমার দিকে ঝাড়ু ছুঁড়ে মেরে বললো, “এটা ধরো শূয়ার। ঝাড়ু দাও। বসে আছো কেনো?”

আমি তাকে বললাম, ‘আমি একজন গেস্ট। ক্লিনার নই। আপনাদের কোথাও ভুল হচ্ছে।’

লোকটিকে একটু বিব্রত মনে হলো। সে ঝাড়ু রেখেই চলে গেলো…

সকাল এগারোটা,

বসেই আছি। এখনো ইংরেজি ফন্টে বড় বড় করে Close লেখা সাইনবোর্ড ঝুলছে। আমি গুটি গুটি পায়ে হেঁটে দারোয়ানের দিকে এগিয়ে গেলাম। আবুল হায়াত ভাইয়ের বয়সী বৃদ্ধ এক দারোয়ান। তাকে বললাম, ‘আর কতক্ষণ বসে থাকবো? রেস্টুরেন্ট কি আজকে খুলবে?’

দারোয়ান আমার দিকে তাচ্ছিল্যের ভঙ্গিতে তাকিয়ে বললো, “কি বাড়া খাবে তুমি? টাকা আছে সাথে?”

“আছে”

দারোয়ান বললো, ১২ টায় খুলবে…

আমি বারোটার অপেক্ষায় বসে রইলাম। বসে বসে মুঠোফোনে গেমস খেললাম। ফ্রেন্ডলিস্টের কয়েকটা মেয়েকে পোকও দিলাম। পোক দিতে আমার ভালো লাগে। মনে হয়, হা করা মুখে সাগর কলা ঢুকিয়ে দিচ্ছি…

বেলা বারোটা,

গেটের সামনে দাঁড়িয়ে আছি। এখনো সাইনবোর্ড ঘুরিয়ে গেট ওপেন করেনি। ওপেন করার সাথে সাথেই ঢুকে পরবো। এক পা আগে বাড়িয়ে রেডি করে রেখেছি। দারোয়ানকে বেশ বিব্রত মনে হচ্ছে। সে গেট খুলে দিলো। আমি দৌড়ে গিয়ে কর্নারের বড় সোফাটায় বসে পরলাম। সোফাতে বসার কারণ হচ্ছে, এদের এই সোফাটাতে কোশন আছে। নবাব সিরাজউদ্দিনের মত আরাম করে বসা যায়…

ওয়েটারকে মামা বলে ডাক দিলাম। ফর্সা চেহারার ওয়েটার। এই লোকের পরিবেশন করা খাবার খেতে ভালো হবে। দেখেই বোঝা যাচ্ছে সে পরিচ্ছন্ন। কাইল্লা না…

– কি খাবেন? চুজ করুন
– সী ফুড প্ল্যাটারে কি কাঁকড়া আছে?
– জ্বি আছে
– তাইলে মামা কাঁকড়াটা কিন্তু আস্তা দিতে হবে। কাটার দরকার নাই।

অর্ডার নিয়ে ওয়েটার চলে গেলো। আমি ভং ধরে বসে আছি। কিছু ভালো লাগছে না। আমি মরে যাবো।

খাবারের অর্ডার দিয়ে ওয়াশরুমে এসে লুকিয়ে থাকতে আমার ভালো লাগে। এতে ওয়েটাররা বিব্রত হয়। ভাবে, আমি পালিয়ে গেছি হাহাহা…

মিনিট দশেক পর,

আমার ডিশ চলে এসেছে। প্লেটে স্কুইড, ঝিনুক, ডোরি ফিশ, স্যামন সবই আছে। শুধু কাঁকড়াটা নেই ! আমি ওয়েটারকে ইশারা করলাম, “কি শালা? কাঁকড়া কোথায়?”

ওয়েটার হাত নেড়ে ইশারায় আমাকে বোঝালো, ২ মিনিট পর আসছে…

দুই মিনিট পর,

কাঁকড়া এসে পরেছে। ওয়েটার আস্তা কাঁকড়া দিয়ে আমার মাথায় বাড়ি দিলো। আমি মাথা ঘুরিয়ে বেঁহুশ হয়ে পরে গেলাম। এরমধ্যে একটা স্বপ্নও দেখেছি, দুঃস্বপ্ন…

জ্ঞান ফেরার পর আমার মাথায় প্রথম যে প্রশ্নটি এলো, সেটি হচ্ছে, অজ্ঞান হলেও কি মানুষ স্বপ্ন দেখে? নাকি দেখে না? ঘুমন্ত অবস্থায় স্বপ্ন দেখতে পারলে অজ্ঞান অবস্থায় স্বপ্ন দেখতে অসুবিধা কোথায় !

আমি খাওয়া শেষ করলাম। বিল দিয়ে উঠে যেতে নিচ্ছি। ঠিক এমন সময় ওয়েটার এসে আমার কলার চেপে ধরলো। আমি চাপাকন্ঠে আর্তনাদ করে তাকে বললাম, ‘আমি কি করেসি?’

সে আমাকে বললো, তুমি শাউ* করেসো…

ওয়েটার আরো বললো, শুধু খেলেই হবেনা। থালাবাটি ধুয়েও দিয়ে যেতে হবে !

একথা বলেই সে আমার কলার ছেড়ে দিলো। আমি ভয়ে কুঁকড়ে গেলাম। পকেট থেকে রুমাল বের করে টেবিল মুছা শুরু করলাম। তারপর প্লেট ধুতে কিচেনে নিয়ে গেলাম। বুয়াদের সাথে ভিম লিকুইড দিয়ে প্লেট ধুতে ভালোই লাগলো…

বের হবার সময় দারোয়ান আমাকে ডেকে ১০ টাকার একটি নোট ধরিয়ে দিলো। আমি তাকে বললাম, এই দশ টাকা দিয়ে আমি কি করবো?

সে আমাকে বললো, ঘন্টা করবে তুমি শালা শূয়র…

Comments

comments