শুক্রবার দিন। সকাল থেকে পকেটে ঝুনঝুনি নিয়ে ঘুরতেছি। ফকিরদের আজ উৎসবের দিন। শুক্রবার হলেই নানান রকম অসুখে আক্রান্ত ফকিররা শহরের রাস্তায় নেমে পরে। এরমধ্যে কিছু আবার সার্কাসের খিলাড়ি। এরা একসময় বৈশাখী মেলায় সার্কাস দেখাত। এখন পা ভাঁজ করে লুঙ্গির ভেতর লুকিয়ে রেখে শুয়ে থাকে। মানুষ আগে সার্কাস দেখে টাকা দিত। এখন ভিক্ষুক দেখে টাকা দেয়।

তবে এরা আমার অডিয়েন্স নয়। আমার টার্গেট হচ্ছে সুস্থ্যসবল ভিক্ষুক, যারা ঝুনঝুনির আওয়াজ শুনে আমার পেছন পেছন ছুটবে। ভাববে, কয়েনের আওয়াজ। আমি ওদেরকে কনট্রিবিউট করার জন্য পকেটভর্তি করে কয়েন নিয়ে ঘুরতেছি। খয়রাত চাইলেই পকেট থেকে মুঠোভর্তি করে কয়েন বের করে ধরিয়ে দিবো। দিতেই থাকবো, দিতেই থাকবো। শেষ আর হবেনা। কয়েনের সাগরে ভাসবে ওরা। কিছু ল্যাংড়া ফকির থাকবে, ওরা কয়েন মুঠ করে উপরের দিকে ফিক্কা মেরে ছিটাবে। মহিলা ফকিরদের মধ্যে যারা একটু জোয়ান থাকবে, তারা গান গাবে, “লেয়লা মে লেয়লা এয়সি হু লেয়লা” ! আর আমি চারপাশে গোল্লা হয়ে ঘুরতে ঘুরতে হাততালি দিবো আর একটু পরপর আঙ্গুল ফুটাবো। গানের পর্ব শেষ হলে সবার সাথে হ্যান্ডশেক করে বাসায় চলে যাবো। পথচারী বাবা আমার দিকে ঈশারা করে তার ছেলেকে বলবে, ওই দেখো কে যাচ্ছে। ওকে চেনো? ও হচ্ছে হ্যামিলনের ঝুনঝুনিওয়ালা…

ভাবতে ভাবতে আমার মুখে সূর্যের হাসি চলে এলো। আমি পকেটে হাত ঢুকিয়ে আরো জোরে জোরে ঝুনঝুনি বাজাতে শুরু করলাম। রাস্তার ওই পাড়ে এক ভিক্ষুককে দেখা যাচ্ছে। এই ভিক্ষুক হচ্ছে কচ্ছপ ভিক্ষুক। কচ্ছপ প্রজাতির মত এরা ধীরগতিতে এগোয়। কচ্চপের মত এদেরও পা আছে। শুধু পার্থক্যটা হচ্ছে, কচ্ছপ হাঁটাচলার জন্য পা ব্যবহার করে। আর এরা মার্শালআর্ট টেকনিক ব্যবহার করে লুঙ্গির ভেতর পা লুকিয়ে রাখে। বুক এবং পিঠের উপর ভর করে গড়াতে গড়াতে চলাচল করে এরা…

তিন মিনিট পেরিয়ে গেলো। এখনো সে বেশিদুর আগাতে পারেনি। এরমধ্যে আবার ট্রাফিক সিগনাল ছেড়ে দিলো। বড় বড় গাড়ির আড়ালে ফকিরটারে আর দেখা যাচ্ছেনা। সিগনাল পরুক, অসুবিধা নেই। পাশের চা দোকানে গিয়ে আমি অপেক্ষা করতে বসলাম। আজ ভিক্ষা দিয়েই যাবো। ঝুনঝুনি বাজিয়ে হারামজাদাটার লোভের লালা ঝরাবো…

দুমিনিট পর আবারো সিগন্যাল পরলো। ফকিরটাকে দেখা যাচ্ছে। ইয়েসস !!

আমি তাকে উৎসাহ দিয়ে ফুটপাথে গিয়ে দাঁড়িয়ে পরলাম। মাথা ঝুঁকে একটু নিচু হয়ে দু হাত বাড়িয়ে বলতে থাকলাম, আসো আসো। কাম অন। আমি জানি তুমি পারবে…

পাঁচ মিনিটেও পারলোনা। আবারো সিগন্যাল ছেড়ে দিলো। লেংলু এখন ট্রাফিকের পায়ের কাছে শুয়ে আছে। আমি বিরক্ত হয়ে উঠে দাঁড়ালাম। পরের সিগন্যাল পরামাত্রই আমি ট্রাফিকের কাছে গিয়ে বললাম, “তুমি একটা দায়িত্বহীন লোক। তোমাকে ট্রাফিক পুলিশ কে বানিয়েছে? দেখতেছোনা লোকটা রাস্তা পার হতে পারছেনা। ভিক্ষা দেয়ার জন্য অপেক্ষা করতেছি আমি। জলদি ওকে কাঁধে করে রাস্তা পার করে দাও। এভাবে দাঁড়ায় থাকলে হবে?”

ট্রাফিককে শাসন করে আমি আগের জায়গায় ফিরে আসলাম। সে ফকিরকে কোলে করে এ পাড়ে নিয়ে এলো। মেজেন্ডা কালারের বাটিটা রাস্তার মাঝেই ফেলে রেখে এসেছে। বললাম, ওটাও নিয়ে আসো…

সে বাটি নিয়ে এলো। আমি তার কপালের ঘাম মুছে একটা চুমু দিয়ে দিলাম। সে খুশি হয়ে চলে গেলো। যাওয়ার আগে ফকিরকে একটা সালামও দিয়ে গেলো হাহাহা। ফকিরটা বোধহয় জীবনে এই প্রথম কারো কাছ থেকে সালাম পেলো। তাকে বেশ খুশি মনে হচ্ছে…

ফকির আমাকে বললো, ‘খয়রাত দেন’। আমি তাকে বললাম, “টাকা নাই। মানিব্যাগ খালি। তোমার মানিব্যাগে কত আছে? আমাকে দেখাও…”

সে বললো তার মানিব্যাগ নেই। কথা শুনেই মাথাটা গরম হয়ে গেলো। পকেট থেকে ঝুনঝুনি বের করে ওর হাতে ধরিয়ে দিয়ে বললাম, “মানিব্যাগ ছাড়া বের হইসো কেন বোকাচোদা। নাও, এইটা ধরো। আঙ্গুল চুষতে চুষতে ঝুনঝুনি বাজাও।”

বাসায় চলে এসেছি। রিকশাওয়ালাকে ঘুষি দিতে গিয়ে হাত কেটে গেছে। ঘুষি দিতে চেয়েছিলাম নাকের উপর। দুর্ঘটনাবশত ঠোঁটের উপর গিয়ে ঘুষি পরেছে। ময়লা দাঁতের খোঁচায় হাতটা কাটলো। বিরক্তিকর ব্যাপার। রিকশাওয়ালার ঠোঁট রক্তে ভেসে যাচ্ছে। আমি ওকে বললাম, “তোমার ফোন বের করো। গুগল প্লে-স্টোরে গিয়ে Charpoka Blood Bank লিখে সার্চ দিলে একটা অ্যাপস পাবা। ওটা ফোনে ইনস্টল করে তুমি প্রতিদিন রক্ত দিবা।”

বাড়তি টাকা চাওয়ায় রিকশাওয়ালাকে মারধর করেছিলাম। ভেবেছিলাম ভাড়া না দিয়েই চলে যাবো। কিন্তু সে আমাদের অ্যাপ ইউজ করে রক্তদান করবে ভেবে তাকে খুশি করার জন্য বাসার সামনের এক হকারকে ধমক দিয়ে ৫০ টাকা নিয়ে তাকে সাধলাম। সে ভাড়া না নিয়েই চল গেলো। এতে আমি মোটেও অবাক হইনি। বরং তার আচরণে আমার মনটা খুব ভালো হয়ে গেলো…

আসলে রক্তদাতারা এরকমই হয়। এই চাহিদা আর স্বার্থান্বেষিতার যুগে নিজের শরীর থেকে এক ব্যাগ রক্ত হুদাই কে কাকে দিয়ে আসতে যায়? কারই বা এত ঠেকা পরেছে, মহামানব ছাড়া !

এই মহামানবেরা দীর্ঘজীবী হোক…

Comments

comments