ফ্যাক্টরি থেকে আমার বাসা বেশি দুরে না। হেঁটে যেতে সময় লাগে দশ মিনিটের মত। রাস্তা ফাঁক‍া থাকলে ফ্যাক্টরির গেট থেকেই বাসার ‍সামনের রাস্তা দেখা যায়। তবে জ্যাম থাকলে দেখা যাবে না। তখন অন্য কাউকে অনুরোধ করে তার কাঁধে উঠে দেখতে হবে…

সন্ধ্যায় ফ্যাক্টরি থেকে বেরিয়ে রিকশার জন্য দাঁড়ালাম। সামান্য দুরেই একটা রিকশা দেখা যাচ্ছে। লোকটা রিকশা রেখে অভিমান করে রাস্তার পাশে দেয়ালের দিকে মুখ করে বসে আছে। আমি তাকে ডাকলাম,

“ওই কুত্তার বাচ্চা এদিকে আয়”

সে আসলো না। কিছুক্ষণ ওভাবেই বসে রইলো। তার হাতে একটা ইটের টুকর‍া ছিলো। সে ওই ইটের টুকরোটি আমার দিকে ছুঁড়ে দ্রুত রিকশা নিয়ে চলে গেলো। আমি বাঁকা হয়ে যাওয়ায় ইটটা আমার গায়ে পড়েনি। পড়লে আমি মারাও যেতে পারতাম…

মাথার উপর মশা গোল্লা পাকিয়ে ঘুরছে। এখানে দাঁড়িয়ে রিকশার অপেক্ষা করলে ব্লাড ব্যাংক বন্ধ করে নিজেই হাসপাতালে গিয়ে ভর্তি হতে হবে। তাই হাঁটা ধরলাম। বাসার বিল্ডিংয়ের দিকে তাকিয়েই মাথা নষ্ট হয়ে গেলো। আমাদের বাড়ি থেকে ধোঁয়া উড়তে দেখা যাচ্ছে। আগুন লেগেছে !

এটা যে কেমন একটা সিচুয়েশন, আমি বলে বোঝাতে পারবোনা। এক মুহুর্ত ন‍া ভেবে আমি দৌঁড়াতে শুরু করলাম। দৌঁড়াতে দৌঁড়াতেই একটা সিগারেট ধরালাম। টেনশনে মাথা ভার হয়ে গেছে। কিভাবে কি করবো কিছুই মাথায় কাজ করছেনা। দৌঁড়াতে দৌঁড়াতেই বাসার দারোয়ান সিদ্দিকের গ্রামের বাড়িতে ফোন দিলাম। এতক্ষণে নিশ্চয়ই সিদ্দিক মারা গেছে। বেচারার গ্রামের বাড়িতে নির্ঘাত শোকের মাতম চলছে। এ অবস্থায় একজন দায়িত্ববান মানুষ হিসেবে আমি ফোন না দিয়ে পারিনা। এটলিস্ট সিদ্দিক মারা গেছে কিনা ব্যাপারটা কনফার্ম হওয়া যাবে। আর কেউ সত্য বলুক বা না বলুক, মা নিশ্চয়ই ছেলেকে নিয়ে মিথ্যা বলবেনা…

সিদ্দিকের মা ফোন ধরেছে –

– চাচী সিদ্দিক কি মারা গেছে?
– কি কও বাব‍া !
– বাসায় আগুন লাগছে দেখলাম। আমি দৌঁড়াচ্ছি। এখনো পৌঁছাতে পারি নাই। সিদ্দিক আছে না মারা গেছে? চেহারা চেনা যায়? ছবি পাইছেন?

ফোন হাত থেকে পরে যাবার শব্দ হলো। সিদ্দিকের মার আহজারিও শোনা যাচ্ছে। তারমানে মারা গেছে !

দৌঁড়াতে দৌঁড়াতে দুর থেকেই ফোনে একটা ছবি তুলে রাখলাম। প্রমাণের অভাবে অনেকেই বীমার টাকা তুলতে পারেনা। একটা ছবি থাকলে অনেক ঝামেলা থেকে বাঁচা যায়। এটা একপ্রকারের প্রামাণ্য দলিল…

বিপদের সময় গন্তব্যের দুরত্ব বেড়ে যায়। রাস্তা যেনো আর শেষই হয়‍না। আমার হিস‍াবে এভাবে দৌঁড়াতে থাকলে ব‍াসায় পৌঁছাতে আর তিন মিনিট লাগবে। এই তিন মিনিটে আর কি কি করা যায় ভাবা শুরু করলাম। চোখের সামনে রাজিবের বাবার মরা লাশ ভেসে উঠলো। কল্পনার জগতে চলে গেলাম, রাজিবের আব্বা গাঁজা বানিয়ে ফুলদানির পাশে দাঁড়িয়ে দারোয়ানকে বলতেসে, ‘খাবি? একটা টাইগার নিয়ে আয়।’ সিদ্দিক গাঁজার লোভে মেইনগেট ফাঁকা রেখেই বাইরে চলে গেছে। লাইটার টেপার সাথে সাথেই চারিদিকে আগুন আর আগুন। রাজিবের আব্বার পুরো শরীরে আগুন লেগে গেছে। পুরো বাড়িতেই আগুন ! সিদ্দিক ফিরে এসে আগুন দেখে বোকাচোদা হয়ে গেছে। সে রাজিবের আব্বাকে বলতেছে, ‘শেষ কইরা ফেলছেন? আমার ভাগেরটা কই? আমার ভাগেরটা কই?’ রাজিবের আব্বা কথা বলেনা। সে গায়ের আগুন নিভাতে ব্যস্ত। চারপাশে উৎসুক জনতার ভীড়। আগুন নেভানোর জন্য সিদ্দিক টাইগারের বোতল খুলে রাজিবের আব্বার গায়ে ঢেলে দিয়েছে। তার দেখা উৎসুক জনতারাও টাইগার কিনে নিয়ে এসেছে। তারা একটা একটা করে বোতল ছুঁড়ে দিচ্ছে। সিদ্দিক ক্যাচ ধরতেছে আর বোতলের ছিপি খুলে রাজিবের আব্বার গায়ে ঢালতেছে। ততক্ষণে সারা বাড়ি আগুনে দগ্ধ। সিদ্দিকও আগুনে পুড়ে গেছে। হাহাহা ! আড়াইবছরের বেতন আটকা ছিলো হারামজাদার। হাহাহা…

কল্পনা করে খুব মজা পেলাম। দারোয়ান আর রাজিবের আব্বা সহ আরো কয়েকজন মারা যাবে ভেবে পা চালিয়ে দ্রুত ছুটে এলাম, যাতে তাড়াতাড়ি লাশ টেনে ভেতর থেকে বের করা যায়। চেহারা গলে গেলে চিনতে পারবোনা। তখন আবার মর্গের ভাড়া দেয়া লাগবে। মর্গের ভাড়া, ভ্যান ভাড়া, কাফনের খরচ, ডোমের বকশিশ, হাবিলদারের আপ্যায়ন, নানানরকম ঝামেলা। বলে শেষ করা যাবেনা…

সাত মিনিটের মাথায় বাসার সামনে চলে এসেছে। কোথাও আগুন দেখ‍া গেলো না। মনে হয় নিভিয়ে ফেলছে। ফায়ার ব্রিগেডের গাড়িও দেখা যাচ্ছেনা। পানির টাকাটা বেঁচে গেছে ভাবতেই মনটা হালকা হয়ে গেলো…

গেটের সামনে গিয়ে হাঁপাতে হাঁপাতে ফুটপাথের বাদামওয়ালারে জিজ্ঞেস করলাম, লাশ কই? লাশ কই? আমাকে দেখাও।

আমার কথা শুনে যেনো তারা অবাক হয়ে গেলো। বললাম, আগুন লাগছেনা? বাদামওয়ালা বললো, আগুন লাগে নাই। মশা মারার ওষুধ স্প্রে করে দিয়ে গেছে…

কথা শুনে মেজাজটাই গরম হয়ে গেলো। ভিতরে ঢুকে দেখি, সিদ্দিক টুলের উপর বসে গেটে মাথা হেলান দিয়ে ঘুমাচ্ছে। তার কপালে মশা বসে আছে।

শালা তুই বাইচা আছস। তোরে জীবিত দেখে যে কত খ‍ুশি লাগতেসে এইটা তো এখন তোর কপালে চুম্মা দিয়েও বুঝাইতে পারবোন‍া। মশা বসে আছে। কপালের উপর মশা পালতেসস।

তারপর উপর এখন এমন একটা অবস্থা হইছে, এরোসোলের গন্ধে রাস্তার মশা সব এসে ঘরের ভেতর ঢুকসে। কিন্তু এরোসোল কেনার টাকা মেয়র এসে দিয়ে যায় নাই। বুঝতে পারতেসিনা, কোন শাউয়া দিয়ে মশা মারবো…

Comments

comments