আমি তোমাকে ভালোবাসি

ঢাকা শহর আসলে একটি ‘একক’ শহর নয়। ঢাকা শহর মানে একসাথে অনেকগুলো শহর। এই শহরের প্রতিটা রাস্তায়, প্রতিটা অলিগলিতে একটা করে শহর আছে। কখনো কারওয়ানবাজার মোড়ে দাঁড়িয়ে মনে হবে এটা একটা শহর, কখনো পলাশীর মোড়ে দাঁড়িয়ে মনে হবে এটাও একটা শহর, আবার কখনো উত্তরা হাউজবিল্ডিংয়ের সামনে দাঁড়িয়ে মনে হবে, এটা আরেকটা শহর। আর এই এক শহরের মধ্যে এতগুলো শহর তখনই খুঁজে পাওয়া যাবে, যখন সেই মানুষটা সাথে থাকবে, যার হাত ধরে শহরের সবকটা ব্যস্ত সড়ক চোখ বুজে পার হওয়া যায়…

আমি সবসময় এক কালারের শার্ট পরে অভ্যস্ত। সবসময় সাদা বা এধরণের লাইট কিছু পরি। আমার পরিচিতরা কমবেশ সবাই জানে, জন্মদিনে আমি সবসময় লুকিয়ে বেড়াই। এ দিনে কেউ যদি আমাকে উইশ করে বা কোনোকিছু গিফট পাঠায়, তাহলে তার কাছে আমার চেয়ে বড় বেয়াদব আর কেউ হয় না। সেই ধারা বজায় রাখতে আমিও তার দেয়া কালো শার্টটা যত্ন করে রেখে তাকে হুদাই বকাঝকা করেছি, “তুমি এইটা কেনো করলে? তুমি কিভাবে পারলে? তোমার কাছ থেকে এটা আশা করিনি। এইটা আমি ছিঁড়ে ফেলবো ইত্যাদি ইত্যাদি”

আসলে কিন্তু আমি খুশি হয়েছি। শার্টটা যত্ন করে রেখে দিয়েছি গরমের দিনে এইটা গায়ে দিয়ে ওর সাথে মিট করে ওকে খুশি করে দেয়ার জন্য। আমি শুকনা মানুষ। তার দেয়া শার্টটা বেশ ঢোলাঢালা। তাই শার্টের ভেতর ভারী আরেকটা কালো গেঞ্জি পরতে হয়েছে, যাতে খারাপ না দেখায়…

সে কিন্তু আমাকে দেখে মোটেও অবাক হলোনা। আমি বোকার মত তাকে বললাম, “এই গরমের মধ্যে সাদা শার্ট বাদ দিয়ে তোমার দেয়া কালো শার্ট পরলাম, তুমি অবাক হলেনা যে?”

… “আমি জানি আপনি কেমন”, মুখে মলিন হাসি নিয়ে এটাই ছিলো তার সহজসরল উত্তর !

আসলে একটা মানুষ যখন তার সাথের মানুষটাকে শুধুমাত্র ‘ভালোবাসার মানুষ’ না ভেবে পরিবারের মানুষ ভাবা শুরু করে, তখন তাকে আর আলাদাভাবে কিছু বুঝিয়ে দিতে হয় না। তখন তার কাছে ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র ব্যাপারগুলোও অসাধারণ কিছু মনে হয়, যেটা কিছুদিন আগেও ছিলো খুব স্বাভাবিক কোনো ব্যাপার। পার্থক্যটা হলো, সম্পর্কের শুরুতে অনুভূতিগুলোর প্রাইভেসি স্ট্যাটাস হয় প্রকাশিত, আর সম্পর্কের পরিপূর্ণ অবস্থায় হয় অপ্রকাশিত। মনে মনে একজন আরেকজনের প্রশংসা করে, আগের চেয়ে আরেকটু বেশি সময় পাশাপাশি থাকতে মন চায়, এইসব আরকি…

মাসখানেক আগে সড়ক দুর্ঘটনায় সে মারাত্মকভাবে ইনজুরড হয়। মাথায় বেশ কয়েকটা সেলাই পরে। চাকরীর জন্য বেশিদিন বিশ্রাম না নিয়েই তাকে আবারো ঢাকার বাইরে ফিরে যেতে হয়। এই বিশটা দিন আমি কম করে হলেও দুইশবার চেয়েছি ৩৮১ কিলোমিটার পথ পাড়ি দিয়ে তাকে একনজর দেখে আসি। প্রতিবার সে এটাই বলেছে, ‘টাকাপয়সা নষ্ট করার দরকার নেই। আপনি ঠিকঠাকভাবে চলাফেরা করুন।’

আজ যখন তাকে ঢাকায় ফিরে পেলাম, তখন মনে হলো ঢাকার মাঝে আমি অনেকগুলো শহর খুঁজে পেয়েছি। ঢাকার প্রতিটা রাস্তায় আমাদের হাত ধরে দাঁড়িয়ে থাকার দরকার আছে…

সকালে চলে গেলাম তার এলাকায়। সেখান থেকে তাকে নিয়ে মেডিকেলে। সে ব্লাড টেস্ট করাবে। আমি সচরাচর রক্ত দিতে খুব ভয় পাই। সুঁই ঢোকানো শুরু করলেই বেহুঁশ হবার ভং ধরে বসে থাকি, যাতে ব্যথা না দেয়। মেয়েদের ল্যাবে ছেলেদের ঢুকতে দেয় না। মেজাজ খারাপ করে বাইরে দাঁড়িয়ে ছিলাম। মনে মনে ভাবছি, রক্ত দিয়ে এসে সে দুর্বল হয়ে যাবে। কাঁধে হাত রেখে আমার কোলে ঢলে পরবে। কিছুক্ষণ পর পানির ঝাপটা খেয়ে যখন চোখ খুলবে, দাঁত দেখায়ে বলবো, ‘আমি আছি তো’ !

এমন কিছুই হলোনা। সে বেরিয়ে এসে আমার হাত থেকে তিন কেজি ওজনের ব্যাগ নিয়ে “চলেন” বলে হাঁটা ধরলো। আমি আবারো সেই বোকা হয়েই পিছে পিছে হাঁটতে থাকলাম…

… মেয়েদের শপিংয়ের খুব বদনাম শুনেছি। জিৎয়ের ‘হান্ড্রেড পারসেন্ট লাভ’ সিনেমা দেখে ভেবেছি, এগুলা সব মিথ্যা, শালা নাটক করে। কিন্তু এবার নিজের জীবন থেকে শিক্ষা নিলাম, এগুলা মিথ্যা না। একের পর এক শাড়ি, থ্রিপিস এমনকি ভ্যানিটি ব্যাগগুলো খুঁটিনাঁটি করে পর্যবেক্ষণ করার সময় ওজনদার ব্যাগ নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকার মত ভয়াবহ যন্ত্রণা যে কাকে বলে, তা এবারই প্রথম বুঝলাম। ওইসময় ব্যাপারটা কষ্টকর মনে হলেও বাসায় ফেরার পর ঠিকই মনে হয়েছে, সে যদি আরো কয়েকটা শাড়ি নিয়ে ঘাটাঘাটি করত অথবা জুতার শোরুমে গিয়ে আরো এক দেড়শ জুতা ট্রায়াল দিয়ে দেখত। আরো কিছুক্ষণ সময় পেতাম একসাথে থাকার জন্য…

সিনেপ্লেক্সে প্রতিবারই একগাঁদা পপকর্ণ নিয়ে বসি। এবার আর আমার মনেই ছিলোনা যে অন্তত দুইটা পেপসি কিনে আনি। পুরোটা সময় থ্রিডি গ্লাস খুলে রেখে তার দিকেই তাকিয়ে ছিলাম। সে তার মত মুভি দেখছিলো। ভাবলাম, মেয়েটা খেয়াল করলোনা…

… হল থেকে বেরিয়ে সে আমাকে বলে, ‘আপনি মুভি দেখলেন না যে?’ !!!

আমি নিজেকে একশো ভাগ গুছিয়ে ফেলেছি শুধু তার জন্য। বাবা মার কথা না শোনা রগচটা ছেলেগুলো যখন শুধুমাত্র ভালোবাসার মানুষকে জিতে নেয়ার জন্য বদলে যায়, তখন তাদের চেয়ে বেশি ভালো কেউ হয়না। আর আমি তো এমনিতেও ভালো (🙇🏻‍♂️)। আমার মনে হয়, একজন সফল মানুষ হিসেবে আমি এখন পুরো দেড়শ ভাগ ভালো। ১৫১ বলে আর কিছু নাই। দেড়শতেই শেষ…

… তবে তুমি বললে দুইশও হবে। শুধু দুইশ না, তিনশ চারশ পাঁচশও হবে। যতদুর বলবে, ততদুরই হবে। এর বদলে শুধু আরেকটা সন্ধ্যা হোক, যেদিন শহরের ভেতর খুঁজে পাওয়া কোনো এক শহরে আরেকবার হাত ধরে দাঁড়িয়ে থাকবে বাসের অপেক্ষায়। আর মনে মনে ভাববে, বাস না আসুক। জীবন এখানেই থেমে থাক !

তুমিও ভাববে, আমিও ভাববো, জীবন মোটেও খারাপ না 💙👤

নোটটা কি নামে সেভ করবো ভেবে পাচ্ছিলাম না। মনে হচ্ছিলো সে পাশে থাকলে এখন এটাই বলতাম, আমার যত্ন নিও, আমি তোমাকে ভালোবাসি ! নোটের নামটাও তাই হয়ে যাক…

Comments

comments